
দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের একটি বিশেষ মহাপরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সাম্প্রতিক সময়ে মিরপুর সেনানিবাসে এক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, "যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া হয় যুদ্ধ করার জন্য নয়; বরং যুদ্ধ এড়ানোর জন্য এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।" মূলত বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পৃথক সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে, যা বর্তমানে অর্থ বিভাগে পর্যালোচনার অধীন রয়েছে।
এই মহাপরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য, যার পরিমাণ ১২,২৩২ কোটি ১৮ লাখ টাকা। দেশের আকাশসীমা নিরাপদ ও সুসংহত রাখতে বিমানবাহিনীতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বহুমাত্রিক যুদ্ধবিমান (MRCA), লক্ষ্যভেদী অ্যাটাক হেলিকপ্টার, দূরপাল্লার রাডার এবং ভিআইপি পরিবহনের জন্য বিশেষ হেলিকপ্টার যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া আধুনিক ড্রোন (UAV), অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি ও রাডার সংযোজিত যুদ্ধবিমান এবং এমএসএএম (MSAM) সিস্টেম ক্রয়ের মাধ্যমে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ বৈমানিক, প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ান তৈরির মাধ্যমে বিমানবাহিনীকে ধাপে ধাপে স্বনির্ভর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এই প্রস্তাবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ সক্ষমতা’সম্পন্ন বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রায় ৯,৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম কেনা হবে। একই সাথে দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে ১,৫৪৭ কোটি টাকা এবং অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থার আওতায় ১,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যাপকভাবে সমুদ্রপথনির্ভর হওয়ায় নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও নেওয়া হয়েছে সমন্বিত উদ্যোগ। দেশীয় জাহাজ নির্মাণশিল্পকে উৎসাহিত করতে এবং ব্লু-ইকোনমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৪টি বড় টহল জাহাজ নির্মাণে ৭৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এছাড়া পেকুয়া সাবমেরিন ঘাঁটির জন্য কাটার সাকশন ড্রেজার, চারটি ভিস্যাট (VSAT) ও প্রশিক্ষণ সিমুলেটরসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্যয় হবে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আরও ৫৮১ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার অধীনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার বিভিন্ন নৌঘাঁটিতে প্রশাসনিক ভবন, বহুতল আবাসিক কোয়ার্টার ও হাসপাতাল নির্মাণসহ ১২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক আইএফএফ (IFF) সিস্টেম স্থাপন করা হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।