
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। গতকাল ১৩ মে ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বহুল প্রতীক্ষিত ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা ফারাক্কা বাঁধের নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্তি পাবে দেশের অন্তত ১৯টি জেলা। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত এই প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
১৯৭৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। এর ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থা যেমন—গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় চলে যায়। এই দীর্ঘমেয়াদী পানি সংকটের কারণে ১৯টি জেলায় ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সুন্দরবনের কেওড়া গাছসহ সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটি মূলত এই সংকট নিরসনে সরকারের একটি বিশাল উদ্যোগ।
প্রকল্পের কারিগরি দিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মূল ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে। এই ব্যারেজে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট এবং ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট থাকবে। ব্যারেজের ওপর দিয়ে একটি রেলওয়ে সেতু নির্মাণের পাশাপাশি সড়ক সংযোগ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস ট্রান্সমিশন পাইপলাইন স্থাপনের বহুমুখী সুবিধা রাখা হয়েছে। এছাড়া, কোনো প্রকার জ্বালানি ব্যয় ছাড়াই এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা জাতীয় গ্রিডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের ফলে শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি-মে) প্রায় ২,৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। সংরক্ষিত এই পানি শাখা নদীগুলোর মাধ্যমে প্রবাহিত করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা হ্রাস করা হবে এবং প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই প্রকল্পের ফলে বছরে প্রায় ২৩.৯০ লাখ টন অতিরিক্ত ধান এবং ২.৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক রিটার্ন অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা বিভাগ জানিয়েছে, প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে। এর মধ্যে খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা; ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের পাবনা, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলা উল্লেখযোগ্য। সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপের ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন ও জীবিকায় আমূল পরিবর্তন আসবে এবং মৃতপ্রায় নদীগুলো ফিরে পাবে তাদের হারানো যৌবন।