
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান রেমিটেন্স অর্জনকারী দেশ হলেও, বিপুল সংখ্যক প্রবাসী থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে নেই, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ফিলিপাইনের মাত্র ২১.৯ লক্ষ প্রবাসী কর্মীর বিপরীতে আমাদের ১ কোটি ২০ লক্ষের বেশি মানুষ বিদেশে অবস্থান করলেও অফিশিয়াল রেমিটেন্সে তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে। এর মূল কারণ হলো 'হুন্ডি' বা 'হাওয়ালা' নেটওয়ার্ক। এই অবৈধ আর্থিক মাধ্যমটি কেবল প্রবাসীদের অর্থ দেশে পাঠানোর পথ নয়, বরং এটি অর্থ পাচার এবং সোনা চোরাচালানের এক শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।
বিগত দেড় দশকে এই সিন্ডিকেট আরও অত্যাধুনিক রূপ ধারণ করেছে। অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী এখন দুবাই গোল্ড অ্যান্ড কমোডিটিজ এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত হয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের মূল ভূখণ্ডে স্বর্ণের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) দেশগুলোতে তারা এমন এক সংগ্রাহক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে ইউনিয়ন ভিত্তিক কাজ করে। প্রবাসী কর্মীরা সামান্য বেশি বিনিময় হার এবং ফি-হীন সুবিধার লোভে এই সংগ্রাহকদের কাছে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ তুলে দেন। কিন্তু এই মুদ্রার অপর পিঠ অত্যন্ত অন্ধকার; প্রবাসীদের সেই বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশের মাটিতেই থেকে যায়, যা দিয়ে পাচারকারীরা স্বর্ণের বার ক্রয় করে বা আন্তর্জাতিক কালোবাজারের লেনদেন নিষ্পত্তি করে।
অন্যদিকে, দেশে থাকা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের অবৈধ পথে উপার্জিত কালো টাকা এই হুন্ডি চক্রের দালালের হাতে তুলে দেয়, যা পরে প্রবাসীদের পরিবারের কাছে দেশীয় মুদ্রায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় সরকার এক ডলারও বৈদেশিক মুদ্রা পায় না, উল্টো বাজারে কালো টাকার প্রভাবে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি ঘটে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশচুম্বী হয়। কার্যত, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার হচ্ছে আর ভেতরে সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের চাপে পিষ্ট হচ্ছে। সরকার যদি আগামী পাঁচ বছরে এই অদৃশ্য চক্রের অন্তত ৩০-৪০% নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে অফিশিয়াল রেমিটেন্স প্রবাহ বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ হওয়া সম্ভব। এটি কেবল অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই।