
মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালীর চলমান সংকট কেবল বিশ্ব তেলের বাজারকেই নাড়িয়ে দেয়নি, এটি ওয়াশিংটনের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের সীমাবদ্ধতাও নতুন করে উন্মোচন করেছে। ইরানের ওপর পশ্চিমা শক্তির চাপ প্রয়োগের ফলে তেলের দাম যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, ঠিক তেমনি গায়ানার মতো উদীয়মান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো বিশ্বমঞ্চে অভাবনীয় ক্ষমতা অর্জন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার সুযোগে গায়ানা এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন 'গেম চেঞ্জার' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গায়ানা বর্তমানে এই সংকটের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির সাপ্তাহিক তেলের রাজস্ব ৩৭০ মিলিয়ন ডলার থেকে লাফিয়ে ৬২৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে তেল সম্পদ দেশটির মোট জিডিপির (GDP) প্রায় ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০২২ সাল থেকে গায়ানার গড় বার্ষিক বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪৭ শতাংশ—যা আধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। ২০১৯ সালে দেশটির মাথাপিছু জিডিপি যেখানে ৫,০০০ ডলারের নিচে ছিল, আইএমএফ (IMF) ধারণা করছে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৫০,০০০ ডলার অতিক্রম করতে পারে।
২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, গায়ানার দৈনিক তেল উৎপাদন এখন ৯ লক্ষ ২৬ হাজার ৫৫০ ব্যারেলে পৌঁছেছে। সরবরাহ নিশ্চিত করতে নেদারল্যান্ডস, ব্রিটেন, স্পেন এবং ইতালির মতো ইউরোপীয় দেশগুলো এখন গায়ানার দিকেই ঝুঁকছে। বর্তমানে গায়ানা প্রতিবেশী দেশ ভেনেজুয়েলার চেয়েও বেশি তেল উৎপাদন করছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন ২ লক্ষ ব্যারেলের বেশি তেল এখান থেকে আমদানি করছে। ২০২৫ সাল নাগাদ গায়ানার মোট উত্তোলিত তেলের ৬০ শতাংশই ইউরোপে রপ্তানি করা হয়েছে, যা মহাদেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখছে।
কর্পোরেট সমীকরণেও গায়ানা এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এক্সোনমোবিলের সাথে ২০১৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী, কোম্পানিটি তাদের বিনিয়োগ খরচ পুনরুদ্ধারের জন্য রাজস্বের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারে। ইরান-ইসরাইল উত্তজনা ও বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় এক্সোনমোবিল এখন নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্থাৎ ২০২৬ সালের মধ্যেই ‘ব্রেক-ইভেন’ পয়েন্টে পৌঁছে যাবে বলে আশা করছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, গায়ানার সার্বভৌম সম্পদ তহবিলও (Sovereign Wealth Fund) দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে এই তহবিলে রেকর্ড ৭৬২ মিলিয়ন ডলার জমা হয়েছে, যা দেশটির ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত করছে।