
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিপুল জয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক মহলে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এই জয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানালেও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে এই পরিবর্তনের ফলে তৈরি হতে যাওয়া সম্ভাব্য জাতীয় ক্ষতি ও নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞ মহলের মতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বিজেপির এই শক্তিশালী উত্থান বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ওপর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষা করা। বাংলাদেশি রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন যে বিজেপি শাসিত পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাদের কট্টরপন্থী মতাদর্শের কারণে সীমান্তে কড়াকড়ি আগের তুলনায় অনেক বেশি বাড়াতে পারে। ইতিপূর্বেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শীর্ষ নেতারা নির্বাচনের প্রচারণাকালে অনুপ্রবেশ বা ‘পুশইন’ ইস্যুকে প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এখন থেকেই ভারতের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে নতুন করে অনুপ্রবেশের আতঙ্ক অনুভব করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ইতোমধ্যেই বিজিবিকে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে জোরপূর্বক কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা সফল না হয়।
দ্বিতীয়ত পানি বণ্টন এবং অভিন্ন নদী নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের যে জটিলতা রয়েছে তা আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। যদিও বিএনপি আশা করছে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদায়ের পর শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নে দিল্লির মোদি সরকারকে সহায়তা করবে তবে অনেক বিশ্লেষক এর ভিন্ন চিত্র দেখছেন। তাদের মতে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি সরকার যদি কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে মিলে নদীর পানির ওপর তাদের অভ্যন্তরীণ আধিপত্য বজায় রাখতে চায় তবে বাংলাদেশ ন্যায্য পানির হিস্যা থেকে আরও বেশি বঞ্চিত হতে পারে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানিপ্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে যা ইতিপূর্বেও বাংলাদেশ জোরালোভাবে দাবি করে আসছিল।
তৃতীয়ত সাংস্কৃতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মধ্যে যে গভীর ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন রয়েছে তা রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতার কারণে নতুন সংকটে পড়তে পারে। অনেক অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ মনে করেন যে কট্টর জাতীয়তাবাদী নীতির কারণে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নতুন কোনো শুল্ক বাধা বা কড়াকড়ি আরোপ হতে পারে যা দুই দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের ভারসাম্য নষ্ট করবে। এছাড়া এনআরসি বা নাগরিক পঞ্জি নিয়ে বিজেপি নেতাদের নিয়মিত হুংকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে চরমভাবে বিঘ্নিত করতে পারে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের এই ক্ষমতার রদবদল বাংলাদেশের জন্য কেবল নতুন সম্ভাবনা নয় বরং বড় ধরণের কূটনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকিও বয়ে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।