রাজধানীর মিরপুর অঞ্চল এখন চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে শুরু করে ১৩ নম্বর সেকশন, মাজার রোড এবং গাবতলী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় সড়ক ও ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে শত শত অবৈধ দোকান। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক এক গোপন প্রতিবেদনে মিরপুর অঞ্চলের ১৫ মিটিরও বেশি চাঁদাবাজির 'স্পট' চিহ্নিত করা হয়েছে। এই স্পটগুলো থেকে প্রতিদিন সংগৃহীত হচ্ছে লাখ লাখ টাকা, যার ভাগ যাচ্ছে স্থানীয় রাজনীতিক থেকে শুরু করে পুলিশের পকেট পর্যন্ত।
পুলিশের করা ১ হাজার ২৮০ জন চাঁদাবাজের তালিকায় মিরপুর অঞ্চল থেকেই ৭২ জনের নাম উঠে এসেছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই চাঁদাবাজদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা হিসেবে ২৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের বড় একটি অংশই স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে মিরপুরের ফুটপাত, লেগুনা স্ট্যান্ড, অটোরিকশা গ্যারেজ এবং এমনকি সরকারি জমিতে বালুর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এই চক্রটি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের ফুটপাতে একেকটি দোকান থেকে দিনে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হয়। কেবল এই একটি এলাকা থেকেই মাসে প্রায় ৯০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়। পুলিশের তালিকায় কুখ্যাত সন্ত্রাসী আব্বাস আলী, ভাগনে সোহেল এবং ছাত্রদল-যুবদলের বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান নেতার নাম রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মিরপুর ও শাহ আলী থানার তৎকালীন কয়েকজন কর্মকর্তা এবং এসআই পদমর্যাদার সদস্যরা এই চাঁদার টাকার ভাগ পেতেন, যার বিনিময়ে ফুটপাত দখল উচ্ছেদে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হতো না।
পল্লবী এলাকায় 'মামুন বাহিনী'র দাপট এখন চরমে। বিদেশে বসে শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন তার বাহিনীর মাধ্যমে আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এবং ঝুট ব্যবসা থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করছে। চাঁদা না দিলে গুলি ও হত্যার হুমকির অভিযোগ নিয়মিত জমা পড়ছে থানায়। একইভাবে গাবতলী বাস টার্মিনালে ইজারার আড়ালে ফুটপাত ও খাবার হোটেল থেকে অবৈধভাবে টাকা তোলার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় পার্টি ও শ্রমিক লীগের সাবেক নেতাদের বিরুদ্ধে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, চাঁদাবাজির বিষয়ে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে ইতোমধ্যেই মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের এই অসাধু জোট বা 'নেক্সাস' না ভাঙলে এবং ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না ফিরলে মিরপুরকে চাঁদাবাজমুক্ত করা অসম্ভব হবে।