১৯৬৯ সালের আগস্ট মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত ছাত্রনেতা আব্দুল মালেক হত্যাকাণ্ড তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই ঘটনার সঙ্গে তৎকালীন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ এবং বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ ছাত্র সংগঠনগুলোর নাম জড়িয়ে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।
ঘটনার সূত্রপাত
১৯৬৯ সালের আগস্টের শুরুতে শিক্ষানীতির আদর্শিক ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করা হয়। ২রা আগস্ট 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন' (NIPA)-এর একটি সেমিনারে আব্দুল মালেক মাত্র ৫ মিনিটের একটি বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি ইসলামী শিক্ষার পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন, যা সাধারণ ছাত্রদের একাংশের মধ্যে বেশ সাড়া জাগায়। এটি ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। ছাত্রদের চূড়ান্ত মতামত বা জনমত যাচাইয়ের জন্য ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে (TSC) ডাকসুর (DUCSU) উদ্যোগে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এই সভার সভাপতিত্ব করছিলেন তৎকালীন ডাকসু ভিপি এবং তুখোড় ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ।
সংঘর্ষের সূচনা
১২ আগস্টের সেই সভায় ছাত্র ইউনিয়নের নেতা শামসুদ্দহা যখন ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন ইসলামী আদর্শের সমর্থক ও মাদ্রাসা থেকে আসা কিছু ছাত্র হট্টগোল শুরু করে। তারা ইসলামী শিক্ষার দাবিতে স্লোগান দিতে দিতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসে। টিএসসির ভেতরে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর আব্দুল মালেক ও তার সঙ্গীরা ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের ক্ষুব্ধ কর্মীরা তাদের তাড়া করে বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) পর্যন্ত নিয়ে যায়।সেখানে আব্দুল মালেককে একা পেয়ে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের একদল কর্মী লাঠি, রড এবং হকিস্টিক দিয়ে বেধড়ক পেটাতে শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, হামলাকারীরা তার শরীরের অন্য কোথাও নয়, বরং সুনির্দিষ্টভাবে মাথায় একাধিক প্রচণ্ড আঘাত করে। মাথায় গুরুতর জখম নিয়ে তিনি অচেতন হয়ে মাঠেই লুটিয়ে পড়েন।
আব্দুল মালেককে হত্যার পেছনে মূলত কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না; এটি ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংঘাতের ফল।