বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে চাঞ্চল্যকর অপরাধগুলোর বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে ‘ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা’ বা পরিকল্পিত গুজব একটি ভয়াবহ হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছরের এক মাদরাসা ছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনাটি এর সর্বশেষ উদাহরণ। গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বানোয়াট তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে— ‘ডিএনএ টেস্টে প্রমাণিত হয়েছে শিশুটির ধর্ষক তার আপন নানা’। তবে বাস্তব অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, এটি কেবল একটি নির্জলা মিথ্যাই নয়, বরং মূল অভিযুক্তকে বাঁচানোর একটি সুসংগঠিত কৌশল।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মূল অভিযোগ
ঘটনার শুরু গত ৩০ এপ্রিল, যখন ভুক্তভোগী শিশুটির মা নেত্রকোনার মদন থানায় একটি ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান ও একমাত্র আসামি হযরত ফাতেমা তুজ্জহুরা মহিলা কওমি মাদরাসার পরিচালক ও শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শিক্ষক সাগর শিশুটিকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালান এবং বিষয়টি জানাজানি হলে প্রাণনাশের হুমকি দেন। বর্তমানে শিশুটি প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা এবং মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে।
ডিএনএ টেস্ট ও বৈজ্ঞানিক সত্যতা
গুজব ছড়ানো হয়েছে যে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট চলে এসেছে। অথচ চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন যে কেউ জানেন যে, বাংলাদেশে অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে ‘প্রি- natal’ বা সন্তান জন্মের আগে ভ্রূণ থেকে নমুনা নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করার ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত এবং এটি আইনি প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে করা হয় না। মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, শিশুটির ডিএনএ টেস্ট এখনও করা হয়নি। সন্তান প্রসবের পরই কেবল ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। সুতরাং, যারা বর্তমানে ‘নানা ধর্ষক’ বলে খবর প্রচার করছেন, তারা মূলত বৈজ্ঞানিক অসম্ভবতাকে পুঁজি করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।
অভিযুক্তের ‘ডিএনএ চ্যালেঞ্জ’ ও আইনি চালবাজি
পলাতক অবস্থায় অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর একটি ভিডিও বার্তায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ডিএনএ টেস্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন। অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘কালক্ষেপণ কৌশল’। তিনি জানেন যে, ডিএনএ টেস্টের চূড়ান্ত ফলাফল আসতে আরও কয়েকমাস সময় লাগবে। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি পলাতক থেকে জনমত নিজের পক্ষে নেওয়ার এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে চাপ দেওয়ার সুযোগ পাবেন। যদি তিনি সত্যিই নির্দোষ হতেন, তবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি পালিয়ে না থেকে আত্মসমর্পণ করতেন। পলাতক থাকা এবং ভিডিও বার্তায় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া মূলত তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করার একটি অপচেষ্টা মাত্র।
ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার লক্ষ্য কী?
এই মামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যখনই মূল আসামি হিসেবে একজন প্রভাবশালী বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নাম উঠে এসেছে, তখনই সোশাল মিডিয়ায় কিছু ‘ফেসবুক পেজ’ কোনো প্রমাণ ছাড়াই শিশুটির পরিবারকে আক্রমণ করতে শুরু করেছে। ‘আপন নানা ধর্ষক’—এই থিওরি সাজানোর পেছনে দুটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে: ১. মূল আসামির ওপর থেকে জনরোষ কমানো। ২. ঘটনাটিকে একটি পারিবারিক কলহ হিসেবে চিত্রায়িত করে মামলাটি হালকা করে দেওয়া।
উপসংহার: সমাজ ও প্রশাসনের করণীয়
২০২৬ সালের এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন আশীর্বাদ, তেমনি নেত্রকোনার এই ঘটনার মতো গুজব ছড়ানো অভিশাপ। একটি ১১ বছরের শিশু যখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তখন তার পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয় করা এবং অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। প্রশাসনের উচিত দ্রুততম সময়ে পলাতক আসামি আমান উল্লাহ সাগরকে গ্রেপ্তার করা এবং গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ব্যবস্থা নেওয়া। সত্য কেবল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় এবং আদালতের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে—কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাইরাল পোস্টের মাধ্যমে নয়।