
স্মৃতির জানলা খুললেই মনে পড়ে যায় সেই মফস্বল শহরের এক চিলতে উঠোন আর ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস। হেমন্তের ভোরে কুয়াশার পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে যখন ঘুম ভাঙত, তখন নাকে আসত শিউলি ফুলের সেই মাদকতাময় সুবাস। আমরা ছোটরা তখন কাড়াকাড়ি করতাম কে কত বেশি ফুল কুড়াতে পারি। ঝুড়ি ভরে ফুল নিয়ে মালা গাঁথা আর সেই মালার গন্ধে সারা ঘর ম ম করা—আজকের যান্ত্রিক জীবনে সেসব যেন রূপকথার মতো মনে হয়। ধুলোমাখা সেই দিনগুলোতে আমাদের কোনো স্মার্টফোন ছিল না, ছিল না ইন্টারনেটের ব্যস্ততা; কিন্তু ছিল এক বুক ভরা শান্তি।
এখনকার মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপের যুগে সেই নীল খামের চিঠির আবেগ হয়তো বোঝানো কঠিন। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার আওয়াজ শুনলেই বুকটা ঢিপ ঢিপ করত—কার চিঠি এল? বিদেশের খালার নাকি দূর সম্পর্কের কোনো বন্ধুর? সেই চিঠি খুলে পড়ার মধ্যে যে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ ছিল, তা আজকের ডিজিটাল টেক্সটে খুঁজে পাওয়া ভার। চিঠির ভাঁজে লুকিয়ে রাখা শুকনো গোলাপের পাপড়ি কিংবা দোয়াত-কলমের কালিতে লেখা সেই আবেগগুলো আজ সময়ের স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে। নস্টালজিক এই মুহূর্তগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কতটা সহজ-সরল জীবন পার করে এসেছি।
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের পর যখন প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা তপ্ত মাটিতে পড়ত, সেই সোঁদা গন্ধের কোনো তুলনা হয় না। জানলার পাশে বসে টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শোনা আর মায়ের হাতের গরম খিচুড়ি ও ইলিশ মাছ ভাজা—এই তো ছিল আমাদের বিলাসিতা। কাগজের নৌকা বানিয়ে জমা জলে ভাসিয়ে দেওয়ার যে আনন্দ, তা আজকের দামী ভিডিও গেম দিতে পারে না। সেই সাধারণ মুহূর্তগুলোই এখন আমাদের সবথেকে বড় সম্পদ হয়ে স্মৃতির পাতায় রয়ে গেছে।
সময়ের চাকায় চড়ে আমরা আজ অনেক দূরে এগিয়ে এসেছি। আমাদের হাতে এখন দুনিয়ার সব প্রযুক্তি, কিন্তু সেই নির্ভেজাল হাসি আর আড্ডার সময়টা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। পাড়ার মোড়ে সেই গোল্লাছুট, কানামাছি আর চড়ুইভাতির দিনগুলো এখন কেবল ছবির ফ্রেমে বন্দী। তবুও মাঝরাতে যখন একা বসে পুরনো অ্যালবামটা ওল্টাই, তখন মনের কোণে সেই নস্টালজিয়া ভিড় করে। মনে হয়, জীবনটা যদি আবার সেই ধুলোমাখা পথেই ফিরে যেত, তবে মন্দ হতো না।