বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)। সংস্থাটির ২০২৬ সালের ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশে সাংবাদিকতা করা ‘কঠিন’ বা ‘খুবই উদ্বেগজনক’ শ্রেণিতে রয়েছে। এই তালিকায় ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, যা গত বছরের তুলনায় তিন ধাপ অবনতি। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৯তম।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার গতিপ্রকৃতি
প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অবস্থানের ব্যাপক ওঠানামা হয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ১৬৫তম অবস্থানে থাকলেও গত বছর তা কিছুটা উন্নতি করে ১৪৯তম অবস্থানে এসেছিল। তবে ২০২৬ সালের সর্বশেষ সূচকে আবারও তিন ধাপ অবনতি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রতিবেদনে প্রতিবেশী দেশ ভারতের অবস্থান জানানো হয়েছে ১৫৭তম। অর্থাৎ, দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: শীর্ষে নরওয়ে, তলানিতে স্বৈরাচারী রাষ্ট্র
আরএসএফ-এর তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে ১১০টি দেশে সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রবণতা বাড়ছে। সূচকের শীর্ষে থাকা তিনটি দেশ হলো নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস ও এস্তোনিয়া। অন্যদিকে সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া (১৭২), ইরান (১৭৭), মিশর (১৬৯) ও তুরস্ক (১৬৩)। এসব দেশে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও সাংবাদিকদের ওপর অব্যাহত চাপের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূচকের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান:
- বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান: ১৫২তম (২০২৫ সালে ছিল ১৪৯তম)।
- ভারতের অবস্থান: ১৫৭তম।
- যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: ৬৪তম (৭ ধাপ অবনতি)।
- ইসরায়েলের অবস্থান: ১১৬তম।
- নিহত সাংবাদিক: ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ২২০ জনেরও বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবনতি
সূচকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণকে একটি ‘পদ্ধতিগত নীতিতে’ রূপান্তর করেছেন বলে আরএসএফ দাবি করেছে। অন্যদিকে, গাজা ও লেবাননে সাংবাদিকদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার কঠোর সমালোচনা করে ইসরায়েলকে ১১৬তম অবস্থানে রাখা হয়েছে।
সংকটের কারণ ও উত্তরণের আহ্বান
আরএসএফ-এর সম্পাদকীয় পরিচালক অ্যান বোকান্দে এই পরিস্থিতির জন্য তিনটি মূল কারণকে দায়ী করেছেন:
- স্বৈরাচারী রাষ্ট্রসমূহের ক্রমবর্ধমান দমন-পীড়ন।
- স্বার্থান্বেষী অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ।
- অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অপপ্রচার।
"বর্তমান সুরক্ষা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়; আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। এই পরিস্থিতিতে নিষ্ক্রিয় থাকা মানেই বিষয়টিকে সমর্থন করা।"
— অ্যান বোকান্দে, সম্পাদকীয় পরিচালক, আরএসএফ।
পরিশেষে, আরএসএফ গণতান্ত্রিক সরকার ও সচেতন নাগরিকদের প্রতি দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। মুক্ত সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
