বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে বিশ্ববাজারে। ইরানের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘দীর্ঘমেয়াদি’ অবরোধ আরোপের প্রস্তুতির খবরে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার অতিক্রম করে এবং এক পর্যায়ে ১২২ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল, যা ২০২২ সালের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ। আজ বৃহস্পতিবার সকালেও তেলের দাম ১২০ ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-জ্বালানি কর্মকর্তাদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক
গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে জ্বালানি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শেভরনের প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থসহ বড় বড় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৈঠকে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর যুদ্ধের প্রভাব কমানোর পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, তেলের আগাম বাজার এবং জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নিবিড় আলোচনা হয়েছে। তবে বাজারের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এই বৈঠকের পর হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, যা সরাসরি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের ‘লাইফলাইন’ এখন অচল
বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান এই পথে জাহাজ চলাচলে কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করে। তেহরান স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, তাদের বন্দরগামী জাহাজগুলো মার্কিন অবরোধের মুখে পড়লে তারাও এই প্রণালিতে কোনো জাহাজ চলতে দেবে না। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে, ইরানের সাথে বাণিজ্য করা যেকোনো জাহাজ তারা সমুদ্রে আটকে দেবে বা ফিরিয়ে দেবে।
ইরানের অর্থনীতির বর্তমান সংকটাপন্ন অবস্থা:
- মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী: ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি এখন ৫৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
- মুদ্রার অবমূল্যায়ন: ইরানি রিয়ালের মান ইতিহাসের রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে নেমে গেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।
- ব্যাপক বেকারত্ব: যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে গত কয়েক মাসে প্রায় ২০ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলে সরকারি তথ্যে জানা গেছে।
- রপ্তানি স্থবিরতা: মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি এবং বন্দর কেন্দ্রিক বাণিজ্য কার্যত থমকে গেছে।
বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা ও বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের পতন
জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি বৈশ্বিক আর্থিক বাজারকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। গতকাল ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক ১.২ শতাংশ এবং জার্মানির ডিএএক্স সূচক ০.২৭ শতাংশ কমেছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, যদি ইরান-সংঘাতজনিত এই বিঘ্ন মে মাসে শেষও হয়, তবুও ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম অন্তত ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর হবে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি।
ট্রাম্পের ‘চাপ প্রয়োগ’ কৌশল ও সমঝোতার আহ্বান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ইরানকে ‘শিগগিরই বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করছেন, সরাসরি বোমা হামলা চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ বজায় রেখে ইরানকে সমঝোতায় বাধ্য করা বেশি কার্যকর হতে পারে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরানকে চাপে ফেলতে দেশটির বন্দরগুলোতে অবরোধ আরও দীর্ঘায়িত করার নির্দেশ দিয়েছেন। জবাবে ইরান জানিয়েছে, তারা বিকল্প বাণিজ্যপথ ব্যবহার করে অবরোধ মোকাবিলা করবে, যদিও বাস্তবে দেশটির অর্থনীতি গভীর সংকটের মুখে।
"আর্থিক বাজার এখন ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন অবরোধের বিষয়টি মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। ফলে তেলের দামে বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী ধারা সহজে থামছে না।"
— ক্যাথলিন ব্রুকস, গবেষণা পরিচালক, এক্সটিবি।
পরিশেষে বলা যায়, তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক অশনি সংকেত। এর ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে। বৈশ্বিক এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে শক্তিশালী কূটনৈতিক উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।
