সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় কালবৈশাখীর প্রভাবে টানা পাঁচ দিনের অতিভারী বর্ষণে ছয়টি হাওরের কৃষকরা চরম দুর্দশা ও আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বৃষ্টির পানিতে ধানক্ষেত তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ধান শুকানোর খলা এবং গ্রামীণ রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় পুরো এলাকায় আগাম বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বছরজুড়ে হাড়ভাঙা খাটুনির পর ঘরে ফসল তোলার মুহূর্তে প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে নিঃস্ব হওয়ার পথে হাজারো কৃষক পরিবার।
হাওরের বুকজুড়ে কান্নার সুর: কৃষকদের আর্তনাদ
উপজেলার ভান্ডাবিল হাওর সংলগ্ন আছানপুর গ্রামের কৃষক জন্টু চন্দ্র দাস তাঁর কষ্টের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, "আমরার অবস্থা খুব খারাপ। হাওরে পার্শ্ববর্তী আছানপুরের বেড়িবাঁধে কালভার্ট বা স্লুইসগেট না থাকায় বুক পানিতে নেমে ধান কাটতে হচ্ছে। যেটুকুই কাটছি, রোদ না থাকায় সেগুলো শুকাতে পারছি না। গতরাতের বৃষ্টিতে মাড়াই করা ধানও পানির নিচে চলে গেছে। এখন ধানের চিন্তায় রাইতে ঘুম আসে না। বউ-বাচ্চা নিয়ে কী খাব, সেই চিন্তায় অস্থির আছি।"
শ্রমিক সংকট ও কারিগরি প্রতিকূলতা
মাঠে ধান পেকে থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। অতিবৃষ্টির ফলে নিচু জমি তো বটেই, অনেক উঁচু জমিও এখন জলাবদ্ধতার শিকার। জমিতে কাদা ও পানি জমে থাকায় আধুনিক হারভেস্টার বা ধান কাটার মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক জায়গায় জ্বালানি সংকটের কারণে দামী মেশিনগুলো হাওরের মাঝেই অকেজো হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট, যার ফলে পাকা ধান দ্রুত ঘরে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাজারে ধানের দাম কম থাকায় উৎপাদন খরচ তোলা নিয়েও শঙ্কিত কৃষকরা।
প্রশাসনের তৎপরতা ও আগাম সতর্কতা
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৩ মে পর্যন্ত এই অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ তৎপরতা বাড়িয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. ওবাইদুল হক জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত হাওর রক্ষা বাঁধের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। কৃষকদের সতর্ক করতে প্রতিটি হাওরে মাইকিং করা হচ্ছে। যাদের জমির ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, তাদের কোনো অপেক্ষা না করে দ্রুত ফসল কেটে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শাল্লা উপজেলার বর্তমান কৃষি পরিস্থিতি একনজরে:
- মোট আবাদি জমি: ২১,৭০০ হেক্টর (বোরো ধান)।
- ধান কাটার অগ্রগতি: হাওর এলাকায় ৬৪% এবং নন-হাওর এলাকায় ৩৩%।
- সতর্কবার্তা: ৮০ শতাংশ পরিপক্ক ধান দ্রুত কেটে ফেলার নির্দেশনা।
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ: ৩ মে পর্যন্ত অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস।
বজ্রপাত ও জীবনের ঝুঁকি
বৃষ্টির সাথে সাথে হাওর এলাকায় বজ্রপাতের ঝুঁকিও বেড়ে গেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিৎ রায় কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, "বিদ্যুৎ চমকানোর ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বজ্রধ্বনি শোনা গেলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। শেষ বজ্রপাতের পরও অন্তত ৩০ মিনিট নিরাপদ স্থানে অবস্থান করা জরুরি।" তিনি আরও জানান, ধান কাটার গতি বাড়াতে বিভিন্ন গ্রামে স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করা হয়েছে যাতে কৃষকরা দ্রুত ফসল ঘরে তুলতে পারেন।
ইউএনও-র আশ্বাস ও মনিটরিং
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস জানিয়েছেন, কাবিটা স্কিম প্রণয়ন ও মনিটরিং কমিটি সার্বক্ষণিক মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, "আমরা প্রতিদিন কৃষকদের সাথে কথা বলছি এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কীভাবে কমানো যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা করছি। হাওরের বাঁধে কোনো সমস্যা দেখা দিলে বা কৃষকরা কোনো সংকটে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা প্রশাসনকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।"
"হাওরের মানুষের জীবন ও জীবিকা একমাত্র ফসলের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতির এই দুর্যোগে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা চেষ্টা করছি সর্বোচ্চ লোকবল নিয়োগ করে দ্রুত ধান কাটা শেষ করতে।"
— পিয়াস চন্দ্র দাস, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, শাল্লা।
পরিশেষে, সুনামগঞ্জের এই বিশাল হাওর অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত বোরো ধানের ওপর টিকে থাকে। আবহাওয়া অনুকূলে না আসলে এবং সঠিক সময়ে ধান কাটা সম্পন্ন না হলে হাজার হাজার কোটি টাকার ফসল নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে জলাবদ্ধতা আর অন্যদিকে শ্রমিক ও জ্বালানি সংকট— সব মিলিয়ে শাল্লার কৃষকদের চোখে এখন কেবলই অন্ধকার। কৃষকরা এখন চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে চেয়ে আছেন, কখন মেঘ কাটবে আর রোদ উঠবে সোনালি ফসল ঘরে তোলার নেশায়।
