বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অপরাধের পরিসংখ্যান নিয়ে জাতীয় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশে এ পর্যন্ত ৪৬৪টি হত্যা মামলা এবং ৬৬৬টি ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে মন্ত্রী দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়ন নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
অপরাধের পরিসংখ্যান ও আসামিদের বর্তমান অবস্থা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দায়েরকৃত ৪৬৪টি হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ৬০৪ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে, ৬৬৬টি ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫৩০ জন আসামি। মন্ত্রী বলেন, "সরকার প্রতিটি অপরাধকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।" তবে তিনি সংসদকে আরও জানান যে, এই সময়ের মধ্যে হত্যা মামলায় ১১ জন এবং ধর্ষণ মামলায় ৭১ জন আসামি আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। জামিন প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি বিচারবিভাগের এখতিয়ার হলেও পুলিশ যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে দ্রুত চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিলের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে যাতে কোনো অপরাধী পার না পায়।
ফ্যাসিবাদী আমলের দখলদারিত্ব ও বর্তমান জিরো টলারেন্স
জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিগত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, "বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে তাদের অনুগত বাহিনী জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং টেন্ডারবাজির মাধ্যমে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।" তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে ভূমি দখলদার ও চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে এবং এসব অপরাধের হার বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশ বাহিনীতে বড় নিয়োগ ও সংস্কারের উদ্যোগ
মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়ার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী পুলিশ বাহিনীর বর্তমান জনবল কাঠামো তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে মোট ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪টি অনুমোদিত পদ রয়েছে। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নতুন করে আরও সাড়ে ১৪ হাজার (১৪,৫০০) পদ সৃষ্টির কাজ করছে।
নতুন নিয়োগের পরিকল্পনা:
- এএসপি (ASP): সরাসরি ৫০০টি নতুন পদ সৃষ্টি।
- সাব-ইন্সপেক্টর (SI): নিরস্ত্র শাখায় ৪ হাজার নতুন পদ।
- কনস্টেবল: ১০ হাজার নতুন পদের বিপরীতে নিয়োগ প্রক্রিয়া।
- বিশেষ নিয়োগ: ২ হাজার সরাসরি এএসআই (ASI) নিয়োগের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন।
মন্ত্রী জানান, পুলিশের পেশাদারিত্ব বাড়াতে এবং জনগণকে দ্রুত সেবা প্রদান করতে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
গুম কমিশনের প্রতিবেদন ও ভুক্তভোগী সহায়তা
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে তথ্য দেন। তিনি জানান, পূর্ববর্তী সময়ে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো তদন্তে গঠিত গুম কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন বর্তমানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে সংরক্ষিত আছে। নিখোঁজ বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আইনি ও সামাজিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রয়েছে এবং প্রতিটি ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নতুন পরিকল্পনা
বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সারের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং টহল ব্যবস্থা জোরদার করার মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকারের দিকনির্দেশনায় গৃহীত নানাবিধ পদক্ষেপের ফলে জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং সার্বিক পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
"হত্যা ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িতদের কঠোর সাজা নিশ্চিত করতে আমাদের তদন্ত কর্মকর্তারা নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর প্রতিটি অবৈধ কর্মকাণ্ডের শেকড় উপড়ে ফেলতে আমরা বদ্ধপরিকর।"
— সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পরিশেষে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে আশ্বস্ত করেন যে, পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় সহায়তার মাধ্যমে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এই সরকারের মূল লক্ষ্য। তিনি দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সকল সংসদ সদস্য এবং সাধারণ জনগণের সহযোগিতা কামনা করেন।
